স্বাস্থ্য সিদ্ধান্তের পেছনে পরিসংখ্যান
ডাক্তার যখন বলেন "এই ওষুধ ৮০% ক্ষেত্রে কাজ করে" বা "আপনার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি গড়ের চেয়ে বেশি" - এগুলো সব পরিসংখ্যান থেকে আসা। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ পরিসংখ্যান ছাড়া চলতে পারে না। কোন ওষুধ অনুমোদন পাবে, কোন চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর, কোন রোগ মহামারি আকার নিচ্ছে - সবকিছু পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হয়।
ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল
নতুন ওষুধ বাজারে আসার আগে কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। এটাকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বলে এবং এটা পরিসংখ্যানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের নতুন ওষুধ পরীক্ষা করা হচ্ছে:
- ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী দৈবভাবে দুই গ্রুপে ভাগ
- ১০০ জনকে নতুন ওষুধ, ১০০ জনকে প্লাসিবো (চিনির বড়ি)
- কেউ জানে না কে কোনটা পাচ্ছে (দ্বি-অন্ধ পরীক্ষা)
- ৭ দিন পর ফলাফল তুলনা
ওষুধ গ্রুপে ৭৫% সুস্থ, প্লাসিবো গ্রুপে ৫০%। P-মান = ০.০০১। উপসংহার: ওষুধ কাজ করে।
প্লাসিবো কেন দরকার? কারণ শুধু "ওষুধ খাচ্ছি" ভাবলেই অনেক রোগী ভালো অনুভব করে (প্লাসিবো ইফেক্ট)। নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ না থাকলে আসল ওষুধের প্রভাব আর প্লাসিবো ইফেক্ট আলাদা করা যায় না।
ঝুঁকি বোঝার পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্যে ঝুঁকি বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হয়, এবং প্রতিটা আলাদা ছবি আঁকে:
পরম ঝুঁকি (Absolute Risk)
নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাব্যতা।
আপেক্ষিক ঝুঁকি (Relative Risk)
এক গ্রুপের ঝুঁকি অন্য গ্রুপের তুলনায় কত গুণ।
ধূমপায়ীদের ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি ধূমপান না করা মানুষের ২০ গুণ (আপেক্ষিক ঝুঁকি = ২০)। ভয়ংকর শোনাচ্ছে। কিন্তু পরম ঝুঁকি দেখুন:
- অধূমপায়ী: ১০,০০০ জনে ১ জনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি
- ধূমপায়ী: ১০,০০০ জনে ২০ জনের ঝুঁকি
২০ গুণ বেশি, কিন্তু এখনো ১০,০০০ এ ২০ - অর্থাৎ বেশিরভাগ ধূমপায়ীরও হবে না। তবে ২০ গুণ বেশি ঝুঁকি নিশ্চয়ই গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে।
সংবাদমাধ্যম সাধারণত আপেক্ষিক ঝুঁকি দেখায় কারণ বড় সংখ্যা বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে।
স্ক্রিনিং পরীক্ষা ও বেইজের উপপাদ্য
স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফল বুঝতে বেইজের উপপাদ্য অপরিহার্য। একটা পরীক্ষা "পজিটিভ" আসলে আতঙ্কিত হওয়ার আগে ভাবুন:
- রোগটা কতটা সাধারণ? (ভিত্তি হার)
- পরীক্ষার সংবেদনশীলতা ও সুনির্দিষ্টতা কত?
বাংলাদেশে ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং: ম্যামোগ্রাফি ৯০% সংবেদনশীল, ৮৫% সুনির্দিষ্ট। ধরুন ৪০ বছরের বেশি নারীদের মধ্যে ক্যান্সারের হার ১%। ১০০০ নারীর পরীক্ষায়:
- ১০ জনের আসলে ক্যান্সার → ৯ জন সঠিক পজিটিভ
- ৯৯০ জনের নেই → ১৪৯ জন ভুল পজিটিভ (১৫%)
- মোট পজিটিভ: ১৫৮ জন, কিন্তু আসলে ক্যান্সার: ৯ জন
পজিটিভ আসলে আসলে ক্যান্সার থাকার সম্ভাবনা: ৯/১৫৮ ≈ ৫.৭%। বেশিরভাগ পজিটিভ ভুল! তাই ডাক্তার আরো পরীক্ষা করেন।
মহামারি ও পরিসংখ্যান
কোভিড-১৯ মহামারিতে পুরো বিশ্ব পরিসংখ্যান শিখেছে - সংক্রমণ হার, মৃত্যু হার, R-নাম্বার (একজন কতজনকে সংক্রমিত করে), টিকার কার্যকারিতা। IEDCR ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব সিদ্ধান্ত ছিল পরিসংখ্যানভিত্তিক।
স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান পড়ার টিপস
- পরম ও আপেক্ষিক ঝুঁকি দুটোই দেখুন
- নমুনা আকার ও গবেষণার ধরন খেয়াল করুন
- কে অর্থায়ন করেছে দেখুন - ওষুধ কোম্পানি নিজের ওষুধ নিয়ে গবেষণা করলে সাবধান
- একটা গবেষণায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না - একাধিক গবেষণার সামগ্রিক ফলাফল দেখুন
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ওষুধ অনুমোদন, ঝুঁকি মূল্যায়ন, রোগ নির্ণয় এবং মহামারি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। পরম বনাম আপেক্ষিক ঝুঁকি বোঝা, স্ক্রিনিং পরীক্ষায় ভিত্তি হারের গুরুত্ব জানা, এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কাঠামো বোঝা - এগুলো আপনাকে স্বাস্থ্য সিদ্ধান্ত আরো বুদ্ধিমানভাবে নিতে সাহায্য করবে।